বাংলা চলচ্চিত্রের দুই যুগের দুই ‘কালপুরুষ’ এর গল্প ঃ

এখন সবাইকে এমন একজন অভিনেতা সম্পর্কে আপনাদের জানাবো যিনি আমাদের চলচ্চিত্রে তিন দশক ছবির কেন্দ্রীয় চরিত্র/ নায়ক চরিত্রে অভিনয় করে গেছেন এবং এখনও অভিনয়ের সাথেই আছেন। তিনি আর কেউ নন তাঁর নাম আলমগীর যাকে সবাই ‘নায়ক আলমগীর’ হিসেবেই চেনে। ছোট  বেলায় যিনি হতে চেয়েছিলেন গায়ক কিন্তু হয়ে গেলেন বাংলা চলচ্চিত্রের নায়ক । তিনি বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের শতাব্দীর শ্রেষ্ঠ অভিনেতাদের তালিকায় ২য় অবস্থানে আছেন । অর্থাৎ বাংলাদেশের চলচ্চিত্রে নায়করাজ রাজ্জাকের পরেই যিনি নিজের আসন পাকাপোক্ত করে ফেলেছেন বহু আগেই তিনি হলেন জীবন্ত কিংবদন্তী আলমগীর ।

১৯৫০ সালের ৩রা এপ্রিল আলমগীর জন্মগ্রহন করেন । তাঁর পিতার নাম দুদু মিয়া যিনি সেই সময়ের একজন প্রতিষ্ঠিত ব্যবসায়ী ছিলেন । ১৯৫৬ সালে নির্মিত বাংলাদেশের প্রথম সবাক চলচ্চিত্র ‘মুখ ও মুখোশ’ এর প্রযোজক ছিলেন আলমগীরের পিতা দুদু মিয়া । সেই সুত্রেই সিনেমার সাথে ছোটবেলা থেকেই আলমগীরের পরিবারের জানাশোনা । ‘আমার জন্মভুমি’ ছবিতে অভিনয়ের মাধ্যমে আলমগীর এর বাংলা চলচ্চিত্রে আগমন। এরপর ৭০ দশকের মাঝামাঝি থেকে ৯০ দশকের প্রথম পর্যন্ত একের পর এক ব্যবসাসফল ছবি উপহার দিয়ে নিজেকে নিয়ে গেছেন অন্য এক উচ্চতায় । আলমগীর শুধু চলচ্চিত্রে একজন অভিনেতা হিসেবেই থেমে থাকেননি তিনি একাধারে একজন প্রযোজক, পরিচালক ছিলেন। সেই সময় সকল প্রযোজক ,পরিচালক এর কাছে আলমগীর ছিলেন সবচেয়ে আস্থাশীল ও নির্ভরশীল একজন অভিনেতা । সামাজিক অ্যাকশন , পারিবারিক টানাপোড়ন, রোমান্টিক অ্যাকশন। ফোক ফ্যান্টাসি সহ সব ধারাতেই আলমগীর ছিলেন সফল । যার ফলে সব ধরনের চরিত্রে আলমগীর ছিলেন মানানসই। বাংলাদেশের সর্বাধিক (৬৭টি) ছবির পরিচালক দেলোয়ার জাহান ঝনটু পরিচালিত ৪০ টি ছবিতেই আলমগীর অভিনয় করেন। এতেই বুঝা যায় যে আলমগীরের উপর নির্মাতারা কি পরিমান আস্থা রাখতেন। কলেজ পড়ুয়া তরুন ছাত্র, পুলিশ অফিসার, মাস্তান, গ্রাম্য যুবক, সহজ সরল বোকা যুবক, ব্যর্থ প্রেমিক, রাজকুমার, বড় ভাই, পিতা সহ সব ধরনের চরিত্রে আলমগীর ছিলেন সফল। চলচ্চিত্রে আলমগীর এমনই আস্থাশীল ছিলেন যে কিছু পরিচালক শুধু আলমগীর ছাড়া তাদের ছবিতে অন্য কাউকে চিন্তা করতে পারতেন না। এছাড়া স্বাধীন পরবর্তী বাংলাদেশের চলচ্চিত্রে এমন পরিচালক পাওয়া দুঃসাধ্য যার সাথে আলমগীর কাজ করেনি। আলমগীর এর উল্লেখযোগ্য ছবিগুলো হলো – আমার জন্মভুমি, দস্যুরানী, মণিহার, দেনা পাওনা, জিঞ্জির, নানটু ঘোটক, ওস্তাদ সাগরেদ, সবুজ সাথী, প্রতিজ্ঞা, ভাত দে, মা ও ছেলে, হালচাল, অস্বীকার, অপেক্ষা, ছেলেকার, বৌমা, মায়ের দোয়া , স্ত্রীর স্বপ্ন, অপরাধী, নিস্পাপ, অশান্তি, স্বামী স্ত্রী, সত্য মিথ্যা, বিশ্বাসঘাতক, দোলনা, চেতনা, অমর, ন্যায় অন্যায়, ক্ষতিপুরন , রাঙ্গা ভাবী , গরীবের বউ, সান্ত্বনা,মরনের পরে, অচেনা, অর্জন, গরীবের বন্ধু , অন্ধ বিশ্বাস , ক্ষমা, অবুঝ সন্তান, বাংলার বধূ, পিতা মাতা সন্তান, শাসন, দেশপ্রেমিক, স্নেহ, অজান্তে সংসারের সুখ দুঃখ, জজ ব্যারিস্টার, রাগ অনুরাগ, ঘাতক , বাপের টাকা সহ প্রায় ২ শতাধিক ছবিতে অভিনয় করেন । ৭০ দশকের শেষ প্রান্তে দিলিপ বিশ্বাস পরিচালিত ‘জিঞ্জির’ ছবিতে প্রথম একই ছবিতে নায়করাজ রাজ্জাক ও সোহেল রানা’র সাথে সমান তালে অভিনয় করে তিনি নিজের অভিনয়ের দক্ষতা দেখিয়ে সবার কাছে বেশ আলোচিত হয়েছিলেন । এরপর ৯০ দশকের শুরুতে নায়করাজ রাজ্জাক ও অভিনেত্রী শাবানার সাথে মতিন রহমানের ‘অন্ধ বিশ্বাস’ ছবিতে দুর্দান্ত অভিনয় করে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারের শ্রেষ্ঠ অভিনেতার পুরস্কার লাভ করেন । ৭০ দশকের শেষ প্রান্তে গীতিকার খোশনূর আলমগীর এর সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হোন। আলমগীর -খোশনূর দম্পতির কন্যা আঁখি আলমগীর (সঙ্গীত শিল্পী) ১৯৮৪ সালে ‘ভাত দে’ ছবির জন্য শ্রেষ্ঠ শিশু শিল্পী হিসেবে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার লাভ করে। ১৯৮৬ সালে আলমগীর তাঁর প্রযোজিত ‘নিস্পাপ’ ছবি পরিচালনা করে পরিচালক হিসেবে আত্নপ্রকাশ করেন। উল্লেখ্য যে ‘নিস্পাপ’ ছবির একটি গানে আলমগীর কণ্ঠ দেন যা খুব জনপ্রিয় হয়েছিল । সেই গানটিই ছিল অভিনেতা আলমগীর এর প্রথম কোন ছবির গানে কণ্ঠ দেয়া গান ।

১৯৮৫ সালে ‘মা ও ছেলে’ ছবির জন্য আলমগীর প্রথম জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার লাভ করেন । এরপর অপেক্ষা , ক্ষতিপূরণ, সত্য মিথ্যা, অন্ধ বিশ্বাস , পিতা মাতা সন্তান ও দেশপ্রেমিক ছবির জন্য জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারের শ্রেষ্ঠ অভিনেতার পুরস্কার লাভ করেন যা ছিল বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের কোন অভিনেতার সর্বাধিকবার শ্রেষ্ঠ অভিনেতার পুরস্কার পাওয়ার বিরল ও একমাত্র ঘটনা। এছাড়া আলমগীর ১৯৮৯ – ৯২ সাল পর্যন্ত একটানা ৪ বার শ্রেষ্ঠ অভিনেতার ( ক্ষতিপূরণ , মরনের পরে , পিতা মাতা সন্তান ও অন্ধ বিশ্বাস) জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার পেয়ে এক অনন্য রেকর্ড করেন যা এখনও কেউ ভাঙতে পারেনি । শুধু ১৯৯৩ সাল বাদ দিয়ে ১৯৯৪ সালে কাজী হায়াত এর ‘দেশপ্রেমিক’ ছবির জন্য আবারও শ্রেষ্ঠ অভিনেতার পুরস্কার লাভ করেন । সর্বাধিক ৭ বার জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারের শ্রেষ্ঠ অভিনেতার পুরস্কার সহ ২০১০ সালে ‘জীবন মরনের সাথী’ ছবির জন্য শ্রেষ্ঠ পার্শ্বঅভিনেতা হিসেবে পুরস্কার নিয়ে সর্বমোট ৮ বার জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার লাভ করেন ।

 

জীবন্ত কিংবদন্তী আলমগিরের পর এবার সবাইকে বলবো চলে যাওয়া বাংলা চলচ্চিত্রের এক ‘তেজি পুরুষ’ এর গল্প যিনি ৯০ দশকের শেষ দিক থেকে মৃত্যুর আগ পর্যন্ত পুরো এক দশক একাই বাংলা চলচ্চিত্রকে টেনে নিয়ে  গিয়েছিলেন । তার অসময়ে চলে যাওয়াটা বাংলা চলচ্চিত্রের জন্য খুবই দুর্ভাগ্যজনক । আশাকরি এতক্ষনে বুঝে গেছেন যে কার কথা বলছি ? হ্যাঁ , তিনি আমাদের ‘মান্না’ । আসুন মান্না সম্পর্কে সংক্ষেপে কিছু জেনে নিই ।

এস এম আসলাম তালুকদার মান্না যিনি আমাদের চলচ্চিত্রের ইতিহাসে স্মরণীয় হয়ে থাকবেন। ১৯৮৪ সালে এফডিসির ‘নতুন মুখের সন্ধানে’ কার্যক্রমে র মাধ্যমে চলচ্চিত্রে যিনি আগমন করেন। তাঁর প্রথম অভিনীত ছবির নাম তওবা কিন্তু প্রথম মুক্তি পায় ‘পাগলি’ ছবিটি। সেই নতুন মুখের সন্ধানে মান্নার সাথে আরও এসেছিলেন খালেদা আক্তার কল্পনা, নায়ক সুব্রত, নায়ক সোহেল চৌধুরী , নিপা মোনালিসা যারা মান্নার জীবিত অবস্থায় হারিয়ে গিয়েছিলেন। মৃত্যুর আগ পর্যন্ত এ যাবত প্রায় ৪০০ ছবিতে অভিনয় করেছিলেন মান্না। ১৯৯১ সালে মোস্তফা আনোয়ার পরিচালিত ‘কাসেম মালার প্রেম’ ছবিতে প্রথম একক নায়ক হিসেবে সুযোগ পেয়েছিলেন। এর আগে সব ছবিতে মান্না ছিলেন ২য় নায়ক। ‘কাসেম মালার প্রেম’ ছবিটি সুপার ডুপার হিট হওয়ার কারনে মান্না একের পর এক একক ছবিতে কাজ করার সুযোগ লাভ করেন। এরপর কাজী হায়াত এর দাঙ্গা ও ত্রাস ছবির কারনে তাঁর একক নায়ক হিসেবে প্রতিষ্ঠা পাওয়া সহজ হয়ে যায়। এরপর মোস্তফা আনোয়ার এর অন্ধ প্রেম, মমতাজুর রহমান আকবর এর ‘প্রেম দিওয়ানা’, ডিস্কো ড্যান্সার, কাজী হায়াত এর দেশদ্রোহী, আকবরের ‘বাবার আদেশ’ ছবিগুলো মান্নার অবস্থান শক্তভাবে প্রতিষ্ঠিত করে।
মান্না একমাত্র নায়ক যিনি ১০০ এরও অধিক পরিচালক ও ৬১ জন নায়িকার সাথে ছবিতে অভিনয় করেন যা যে কোন অভিনেতার জন্য একটি বিরল রেকর্ড।৮০র দশকে মান্না যখন ছবিতে আসেন তখন চলছিল আলমগীর, রাজ্জাক, জসীম, ফারুক, জাফর ইকবাল , ইলিয়াস কাঞ্চন দের স্বর্ণযুগ। সেখানে মান্না তওবা, পাগলী , ছেলেকার, নিস্পাপ, পালকি, দুঃখিনী মা,বাদশা ভাই এর মতো ব্যবসা সফল ছবি উপহার দেয়। কিন্তু সবগুলো ছবিতে মান্না ছিলেন ছবির ২য় নায়ক। তাই ব্যবসার কৃতিত্ব কখনও আলমগীর, কখনও রাজ্জাক, কখনও ফারুকের উপর যেতো।

৯০ দশক আমাদের বাংলা চলচ্চিত্রের একটি স্মরণীয় দশক। এই দশকে পুরনো নায়ক নায়িকাদের পাশে আমরা পেয়েছিলাম অনেক নতুন মুখের অনেক সেরা ছবি যেগুলো বাণিজ্যিক ছবির ব্যবসার তুঙ্গে নিয়ে যায়। ৯০ দশকের শুরুটা ছিল কাঞ্চন ও রুবেল এর জন্য দারুন ও সেরা সময়। রুবেল অভিনীত শিবলি সাদিক এর ‘অর্জন’ ‘মা মাটি দেশ’ , খোকনের ‘বিপ্লব’, ‘সন্ত্রাস’, ‘টপ রংবাজ’ এ যে রানার ‘মহাগুরু’, ‘মৃত্যুদণ্ড’ আবুল খায়ের বুলবুল এর ‘শেষ আঘাত’ ‘মায়ের কান্না’ র মতো সুপারহিট সব ছবি । অন্যদিকে নায়ক ইলিয়াস কাঞ্চন অভিনীত আজিজুর রহমান বুলির ‘বাপ বেটা ৪২০’ (মান্নাও ছিল) , শিবলি সাদিক এর ‘মা মাটি দেশ’ ‘মাটির কসম (১০০ তম ছবি)’ ফজল আহমেদ বেনজীর এর ‘প্রেমের প্রতিদান’ ‘বেপরোয়া’, নুর হোসেন বলাই এর ‘এই নিয়ে সংসার’ ‘মহৎ’ তজাম্মেল হক বকুলের ‘গারিয়াল ভাই’ সোহানুর রহমান সোহান এর প্রথম ছবি ‘বেনাম বাদশা’, ওয়াকিল আহমেদ এর ‘সৎ মানুষ’ মমতাজুর রহমান আকবর এর ‘চাকর’ এর মতো সব সুপারহিট ছবি। এতো সুপারহিট ছবির মাঝে মান্না নিয়ে আসে ১৯৯১ সালে মোস্তুফা আনোয়ার এর ‘কাসেম মালার প্রেম’ ছবিটি যা ছিল তাঁর প্রথম একক ছবি। ছবিটি সুপারহিট ব্যবসার কারনে আমরা পাই এতদিনের ২য় নায়ক মান্নার নতুন একটি রুপ। এরপর মোস্তফা আনোয়ার এর ‘অন্ধ প্রেম’, অশোক ঘোষ এর ‘শাদী মোবারক’ বুলবুল আহমেদ এর ‘গরম হাওয়া’ কাজী হায়াত এর দাঙ্গা , ত্রাস সাইফুল আজম কাশেম এর ‘সাক্ষাৎ’, কামাল আহমেদ এর ‘অবুঝ সন্তান’ (আলমগীর) , দেলোয়ার জাহান ঝনটুর ‘গরীবের বন্ধু’ (আলমগীর) দিয়ে কাঁপিয়ে দেয়া মান্না ধীরে ধীরে এগুতে থাকেন। ৯১-৯৩ নতুন মুখ নাইম -শাবনাজ ও ৯৩-৯৬ সালমান -শাবনুর, সানী -মৌসুমি জুটির ব্যবসা সফল ও দারুন সব ছবির পাশাপাশি মান্না হাজির হয় মমতাজুর রহমান আকবর এর ‘প্রেম দিওয়ানা’ বাবার আদেশ , কাজী হায়াত এর ‘সিপাহী’, ‘দেশপ্রেমিক’ , দেশদ্রোহী , নুর হোসেন বলাই এর ‘ওরা তিনজন’ ‘শেষ খেলা’, নাদিম মাহমুদ এর ‘আন্দোলন’ ‘রুটি’ ‘রাজপথের রাজা’, এম এ মালেক এর ‘দুর্নীতিবাজ’ এফ আই মানিকের ‘ বিশাল আক্রমন’ মোস্তাফিজুর রহমান বাবুর ‘চিরঋণী’ এ যে রানার ‘মানুষ’ বেলাল আহমেদ এর ‘সাক্ষী প্রমান’ মমতাজুর রহমান আকবর এর ‘ডিস্কো ড্যান্সার’, ‘বশিরা’ মতো সুপারহিট ছবি দিয়ে মান্না নিজেকে প্রমান করতে থাকেন আর দিন দিন পরিচালকদের আস্থা অর্জন করেন।


৯৬ তে সালমান এর মৃত্যুর পর সালমান- সানী যুদ্ধের অবসান ঘটে। তখন পরিচালকরা একজন আস্থাশীল নায়কের সন্ধান করতে থাকেন যেন তাঁদের ব্যবসা লোকসান না হয়। ঠিক সেই সময়ে মান্না পুরো চলচ্চিত্র ইন্ডাস্ট্রিকে নিজের কাঁধে তুলে নেয়ার মতো কঠিন কাজ পালন করেন। ৯৭ সালে নায়ক হয়ে প্রযোজকের খাতায় নাম লিখান মান্না। সেই ছবি পরিচালনার দায়িত্ব দেন কাজী হায়াত কে যার পরিনাম লুটতরাজ এর মতো একটি সুপার ডুপারহিট ছবি। শুরু হয় মান্নার আসল যুগ। মুক্তি পেতে থাকে এনায়েত করিমের ‘ক্ষুধার জ্বালা’ নাদিম মাহমুদ এর ‘এতিমরাজা’ কাজী হায়াত এর ‘তেজী’, আকবরের ‘শান্ত কেন মাস্তান’ ইস্পাহানি আরিফ জাহানের ‘মোস্তফা ভাই ‘ দেলোয়ার জাহান ঝনটুর ‘রাজা বাংলাদেশী’ এর মতো বছরের সেরা ব্লকব্লাসটার ছবি। শুরু হয়ে যা চারদিকে মান্না নামের ঝড়। সবাই তখন মান্না কে নিজের ছবিতে নিতে ছুটছে। চলচ্চিত্রের প্রযোজক পরিচালকরা পেলেন নতুন আশার আলো। মাঝে মাঝে রুবেল খানিকটা ঝিলিক দেখালেও মান্নার মতো নিয়মিত ঝিলিক দেখাতে ব্যর্থ । ৯৯ সালে মুক্তি পায় আকবরের ‘কে আমার বাবা’, কাজী হায়াত ‘[link|আম্মাজান ‘ রায়হান মুজিব ও আজিজ আহমেদ বাবুল এর ‘খবর আছে’ মালেক আফসারি পরিচালিত ২য় প্রযোজিত ছবি ‘লাল বাদশা মতো সুপারহিট ছবি।
আম্মাজান ছায়াছবির কারনে মান্না সেই বছর বাচসাস এর সেরা নায়ক এর পুরষ্কার পান। ২০০০ এর দিকে যখন বাংলা চলচ্চিত্রের একটু একটু করে আঁধার নামতে থাকে তখন একমাত্র নায়ক মান্নার ছবিগুলো ছিল প্রযোজক ও পরিচালকদের আশার আলো এবং ব্যবসায় টিকে থাকার সাহস। মুক্তি পেতে থাকে কাজী হায়াত এর ‘আব্বাজান ( এই ছবির কারনে ২য় বার বাচসাস পুরষ্কার প্যেছিলেন) , মালেক আফসারির ‘মরণ কামড়’, ছটকু আহমেদ এর ‘শেষ যুদ্ধ’ আকবরের ‘গুন্ডা নাম্বার ওয়ান, কুখ্যাত খুনি, কাজী হায়াত এর ‘বর্তমান’, এফ আই মানিকের ‘সুলতান , বদিউল আলম খোকনের ‘দানব’ আকবরের ‘ আঘাত পাল্টা আঘাত’, ‘মাস্তানের উপর মাস্তান’ ‘জীবন এক সংঘর্ষ , এফ আই মানিকের ‘স্বামী স্ত্রীর যুদ্ধ’, কাজী হায়াত এর ‘সমাজকে বদলে দাও’ , দেলোয়ার জাহান ঝনটুর ‘বীরসৈনিক’ জিল্লুর রহমান এর ‘ঈমানদার মাস্তান’, ইস্পাহানি আরিফ জাহান এর ‘নায়ক’ , কাজী হায়াত এর ‘মিনিস্টার ‘ ‘কষ্ট মালেক আফসারির ‘বোমা হামলা’ শহিদুল ইসলাম খোকনের ‘ভেজা বিড়াল ‘, এফ আই মানিকের ‘দুই বধু এক স্বামী’, মোস্তাফিজুর রহমান বাবুর ‘ অশান্ত আগুন’ ইস্পাহানি আরিফের ‘ ভিলেন’ আকবরের ‘আরমান’ ‘টপ সম্রাট’ শাহাদত হোসেন লিটন এর ‘কঠিন পুরুষ’ , বদিউল আলম খোকন এর ‘রুস্তম’ এফ আই মানিকের ‘ভাইয়া’, বদিউল আলম খোকনের ‘ধংস,’ ‘বাবার কসম’ ,’বাস্তব’ শাহিন সুমন এর ‘নেতা’, মনোয়ার খোকনের ‘সত্যর বিজয়’, শরিফ উদ্দিন খান দিপুর ‘ ‘বাঁচাও দেশ’ আহমেদ নাসির পরিচালিত ‘ মনের সাথে যুদ্ধ’ এর মতো অসংখ্য সুপারহিট ছবি। বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের সবচেয়ে খারাপ সময়ে এতো বেশী সুপারহিট ব্যবসাসফল ছবি আর কোন নায়কের নেই। ৯৭ থেকে মৃত্যুর আগ পর্যন্ত (২০১০ এর ফেব্রুয়ারি) মান্না একাই বাংলা চলচ্চিত্রকে টেনে নিয়ে গেছেন।

কারন ঐ সময়ে মান্নার চেয়ে এতো বেশী ব্যবসা সফল ছবি আর কেউ দিতে পারেনি। এমনও বছর গিয়েছে যেখানে সেরা ১০ টি ব্যবসা সফল ছবির নাম খুজলে সব মান্নার ছবি পাওয়া গিয়েছিল। নবিন- প্রবীণ সব পরিচালকের কাছে মান্না ছিল সবচেয়ে আস্থাভাজন নায়ক। যাকে নিয়ে ছবি বানালে ক্ষতি হওয়ার সম্ভাবনা নেই। কাজী হায়াত, আকবর ,এফ আই মানিক, মালেক আফসারি, ইস্পাহানি আরিফ এর মতো সিনিয়র পরিচালকরা যেমন মান্নাকে নিয়ে একাধিক সুপারহিট ছবি দিয়ে নিজের ক্যারিয়ারকে শক্ত করেছেন তেমনি এই দশকের বদিউল আলম খোকন, শাহিন সুমন, শাহাদত হোসেন লিটন, শরিফুদ্দিন খান দিপুর মতো ব্যস্ত পরিচালকরা মান্নাকে দিয়ে সফল হয়ে নিজেদের সফলতার মুখ দেখেছেন। মান্না একমাত্র নায়ক যিনি ১০০ এর বেশী পরিচালকের ছবিতে অভিনয় করেছিলেন । মান্নার পরিচালকদের মাঝে উল্লেখযোগ্য হলেন – দেলোয়ার জাহান ঝনটু, মোস্তফা আনোয়ার, কামাল আহমেদ, সাইফুল আজম কাশেম, জহিরুল হক, কাজী হায়াত, মমতাজুর রহমান আকবর, শফি বিক্রম্পুরি, আবুল খায়ের বুলবুল, মমতাজ আলী, নাদিম মাহমুদ, এনায়েত করিম, ইস্পাহানি আরিফ জাহান, ইফতেখার জাহান, আজিজুর রহমান বুলি, জিল্লুর রহমান, মোহাম্মদ হোসেন, বাদশা ভাই, এফ আই মানিক, বদিউল আলম খোকন, শাহাদত হোসেন লিটন, নুর হোসেন বলাই, বেলাল আহমেদ , মোস্তাফিজুর রহমান বাবু , মালেক আফসারী ও শহিদুল ইসলাম খোকন। এতো বেশী পরিচালকের ছবিতে বাংলার আর কোন নায়ক অভিনয় করেনি।

সেই ৮০র দশকে সুনেত্রা, নিপা মোনালিসা থেকে শুরু করে চম্পা, দিতি, রোজিনা, নতুন, অরুনা বিশ্বাস, কবিতা এর মতো সিনিয়র নায়িকাদের সাথে অভিনয় করে যেমন সফল হয়েছিলেন তেমনি মৌসুমি, শাবনুর, পূর্ণিমা, মুনমুন, সাথী,স্বাগতা, শিল্পী,লিমা সহ এই দশকের নায়িকাদের সাথে সফল হয়েছিলেন যার বিপরীতে নায়িকার সংখ্যা ৬১ জন বেশী। মান্না আমাদের বাণিজ্যিক ছবির ইতিহাসে একটি স্মরণীয় নাম হয়ে থাকবে। তাঁর অভিনয়, কথার ধরন সব কিছু মিলেই একটা আলাদা স্বতন্ত্র স্টাইল তিনি দাঁড় করিয়েছিলেন। এমন কিছু ছবি আছে যার জন্য মান্না চিরদিন দর্শকদের মনে স্থান করে নিয়েছেন। মান্না ছাড়া হয়তো আমরা সেইসব ছবি পেতাম না। একটা সময় ছিল যখন ছবিতে শুধু মান্না আছে তাঁর কারনেই দর্শক হলে ছুটে গিয়েছিল, তাঁর কারনেই ছবিটি ব্যবসা সফল হয়েছিল। মান্না যে ছবিতে দুর্দান্ত সে ছবির কাহিনী যত গতানুগতিকই হোক না কেন সেই ছবি ব্যবসা করবেই তাতে কোন সন্দেহ নেই। সমসাময়িক রাজনৈতিক পটভূমির সাহসী প্রতিবাদী গল্পের এমন কিছু ছবি মান্না আমাদের দিয়েছিলেন যা অন্য আর কোন নায়ক দিতে পারেনি ও আগামীতে পারবে কিনা সেটা নিয়েও সন্দেহ আছে। যে ছবিগুলো আমাদের চলচ্চিত্রকে করেছে সমৃদ্ধ । আজ হলবিমুখ বাংলা চলচ্চিত্রের করুন সময়ে আরেকজন ‘মান্না’ কে খুব বেশী প্রয়োজন যার কারনে ছবি পাড়া আবার সরগরম হবে, প্রযোজক পরিচালকরা ব্যবসা করার সাহস পাবে সর্বোপরি বাংলা চলচ্চিত্র আবার জেগে উঠবে এমন আরেকজন ‘মান্নার আশায় পুরো বাংলা চলচ্চিত্র।

লেখক – ফজলে এলাহী (পাপ্পু)
যোগাযোগ – কবি ও কাব্য
একটি http://www.radiobg24.com এর নিবেদন ।

Advertisements

One thought on “বাংলা চলচ্চিত্রের দুই যুগের দুই ‘কালপুরুষ’ এর গল্প ঃ

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out /  পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  পরিবর্তন )

Connecting to %s